আষাঢ়ী পূর্ণিমা (পাঠ : ৪)

ষষ্ঠ শ্রেণি (মাধ্যমিক) - বৌদ্ধধর্ম শিক্ষা - ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব | NCTB BOOK
816

আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিই আষাঢ়ী পূর্ণিমা নামে খ্যাত। গৌতম বুদ্ধের জীবনের তিনটি ঐতিহাসিক ঘটনা আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সংঘটিত হয়েছিল। এগুলো হলো মাতৃগর্ভে প্রতিসন্ধি গ্রহণ, গৃহত্যাগ এবং প্রথম ধর্ম প্রচার।
কথিত আছে যে, এ শুভ পূর্ণিমা তিথির রাতে শাক্যরাজ্যের রানি মায়াদেবী একটি অপূর্ব স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে তিনি দেখেন যে, দেবতারা তাঁকে একটি মনোরম পালঙ্কে করে অনোবতপ্ত হ্রদের তীরে নিয়ে যান। কিছুক্ষণ পরই একটি সাদা হাতি ডান দিক দিয়ে তাঁর শরীরে একটি শ্বেতপদ্ম প্রবেশ করিয়ে দেয়। পরদিন রানি রাজা শুদ্ধোদনকে তাঁর সুন্দর স্বপ্নটি বর্ণনা করেন। রাজা শুদ্ধোদন জ্যোতিষীদের ডেকে স্বপ্নের কারণ জানতে চান। জ্যোতিষীরা বলেন, মহারাজ শীঘ্রই পুত্রসন্তান লাভ করতে যাচ্ছেন এবং এই ভাবী পুত্রসন্তানই হবেন মহাজ্ঞানী বুদ্ধ। এ আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতেই সিদ্ধার্থ মাতৃজঠরে প্রতিসন্ধি গ্রহণ করেন।

এমনই এক আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে সংসারের সকল ভোগ-বিলাস ত্যাগ করে দুঃখমুক্তির পথ অন্বেষণে তিনি গৃহত্যাগ করেন। এ সময় সিদ্ধার্থ গৌতমের বয়স হয়েছিল উনত্রিশ বছর। রাজত্ব ও স্ত্রীপুত্রের মায়া ত্যাগ করে তিনি রাজপ্রাসাদ ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। এ ঘটনাটি 'মহাভিনিষ্ক্রমণ' নামে বৌদ্ধ সাহিত্যে পরিচিত। মহাভিনিষ্ক্রমণ বলতে বুদ্ধের গৃহত্যাগকে বোঝায়।
বুদ্ধত্ব লাভের পর আরো এক আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে তিনি সারনাথে পঞ্চবর্গীয় শিষ্যদের মাঝে প্রথম ধর্ম প্রচার করেন। পঞ্চবর্গীয় শিষ্যরা হলেন কোণ্ডণ্য, বঙ্গ, ভদ্রিয়, মহানাম ও অশ্বজিত। বুদ্ধের প্রচারিত প্রথম ধর্মবাণীকে বলা হয় 'ধর্মচক্র প্রবর্তন সূত্র'। জীবজগতের কল্যাণে তিনি আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতে এই সূত্র দেশনা করেছিলেন। বুদ্ধের মহৎ জীবনের স্মৃতি বিজড়িত এই আষাঢ়ী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে বিশেষ স্মরণীয় ও বরণীয় তিথি।
এ পূর্ণিমার সাথে আরো কিছু ধর্মীয় বিষয় সংযুক্ত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: ১) আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতেই বুদ্ধ ভিক্ষুদের ত্রৈমাসিক বর্ষাবাসব্রত পালনের নির্দেশ দেন। তখন থেকে ভিক্ষুরা আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে কার্তিক পূর্ণিমা পর্যন্ত তিন মাস বর্ষাব্রত পালন করে থাকেন। এ সময় তাঁরা ধর্ম-বিনয় অধ্যয়ন এবং ধ্যানচর্চায় রত থাকেন। সে সময় জরুরি কারণ ছাড়া কোনো ভিক্ষু নিজ বিহারের বাইরে রাত্রিযাপন করতে পারেন না। এটি ভিক্ষুদের বিনয় বিধান। ২) আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতেই বুদ্ধ পরলোকগত মাতা মায়াদেবীকে ধর্ম দেশনার জন্য তাবতিংস স্বর্গে গমন করেন। সেখানে তিনি তিন মাস অবস্থান করেন এবং মাতা মায়াদেবী ও দেবতাদের নিকট অভিধর্ম দেশনা করেন। ৩) আষাঢ়ী পূর্ণিমা তিথিতেই তিনি যমক ঋদ্ধি প্রদর্শন করেন।

বুদ্ধপূর্ণিমার মতো, এ পূর্ণিমা তিথিতেও উপাসক উপাসিকাগণ বিহারে সমবেত হন। ভিক্ষুদের কাছ থেকে তাঁরা পঞ্চশীল ও অষ্টশীল গ্রহণ করেন। যাঁরা অষ্টশীল গ্রহণ করেন, তাঁরা ঐ দিন উপোসথ পালন করেন। এ সময় ভিক্ষুরা উপাসক-উপাসিকাদের উদ্দেশে ধর্ম দেশনা করেন। এতে গৃহীদের মধ্যে ধর্মভাব বৃদ্ধি পায়। এছাড়া একসাথে সম্মিলিত হয়ে ধর্ম শ্রবণ ও ধর্ম চর্চা করার কারণে নিজেদের মধ্যেই সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি গড়ে ওঠে এবং পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় হয়।
ভোর থেকেই আষাঢ়ী পূর্ণিমার উৎসব শুরু হয়। দিনব্যাপী নানা অনুষ্ঠানে মুখর হয়ে ওঠে বৌদ্ধবিহার। সন্ধ্যায় প্রদীপ পূজা, বুদ্ধকীর্তন এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শেষ হয় সমগ্র কর্মসূচি। অনেকে এ তিথিকে উপলক্ষ করে নিজ বাড়িতে বসে রাত পর্যন্ত বিদর্শন ভাবনা করেন। আবার অনেকে তিন দিন বা এক সপ্তাহের জন্য ধ্যান কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেন। এভাবে আষাঢ়ী পূর্ণিমায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়।

অনুশীলনমূলক কাজ
আষাঢ়ী পূর্ণিমায় সংঘটিত বুদ্ধের জীবনের তিনটি ঘটনা বর্ণনা করো।

Content added By
Promotion
NEW SATT AI এখন আপনাকে সাহায্য করতে পারে।

Are you sure to start over?

Loading...